“সেদিন পকেট থেকে কন্ডোম বেরোয়নি, বেরিয়েছিলো রাখী”

“কি! আমাদের কাছে পরবে? কি পরবে? রাখি! শালা সক্কাল সক্কাল মজাক মারতে এসছো?”- ঠিক এরকমই ছিল প্রতিক্রিয়াটা যখন ওদেরকে প্রথম আমার ইচ্ছেটা জানালাম। অবশ্য অবাক হইনি, আশানুরুপই ছিল।

কাদের কথা বলছি? বলছি, তাদের কথা যাদের প্রতিদিন বর্ধমানের বড়বাজার চত্বরে পেটের দায়ে, “বসতে” দেখেন। যাদের দেখে এই আমাদেরই মধ্যেকার কিছু মানুষ দিনের আলোয় “ভদ্রতার” রুমালে নাক-মুখ ঢেকে জায়গাটা পেরোন তবে আড়চোখে ঠিক জরিপ করে নেন। আর রাতের অন্ধকারে একটু রঙীন হতে যান তাদের কাছেই। তখন অবশ্য আর রুমালটা লাগেনা। যে জায়গার নাম নিলে কিছু লোক এমন ভাব করেন যেন ISIS এর জঙ্গীদের আড্ডা। ঠিকই বুঝছেন। বলছি মহাজনটুলির মহিলাদের কথা যাদের পাতি কথায় ‘বেশ্যা’ বলেন।

চোখ কপালে উঠল? আশপাশটায় দেখলেন কেউ আছে নাকি? আমায় নীচ একটা ছেলে ভাবলেন? “ছিঃ! এসব জায়গায় গিয়ে আবার লেখে” – ভাবলেন? ভাবুন। এরপর, লেখার কারনটা পড়ুন। যে উদ্দেশ্য নিয়ে আমার তাদের কাছে যাওয়া তা হল, রাখিপূর্ণিমা।

হ্যাঁ। সেদিন সকালবেলা বেখেয়ালি মনে হঠাৎই খেয়াল এলো, বাড়ীতে, আশেপাশে বোন-দিদির কমতি নেই। কিন্তু এবারের রাখী একটু অন্যরকম ভাবে উপভোগ করা যাক। জানেন তো, যে যেই জিনিসটা কখনো পায়নি তাকে সেই জিনিস দিয়ে যে অকল্পনীয় আনন্দ, সেটা আর কিছুতে নেই। তো যথা চিন্তা তথা কর্ম করে সেদিন কিছু খাবার আর রাখী নিয়ে চললাম সেই নিরুদ্দেশের উদ্দেশ্যে। আব্দার ছিল আমায় রাখী পরাতে হবে। মিথ্যে বলবো না, ওরা ওদের স্বাভাবিক চালে অভ্যর্থনা করেছিল তবে আমার উদ্দেশ্য ওদের বলার পরে ওদের প্রতিক্রিয়া আপনাদের নিকট পূর্বেই জ্ঞাত করিয়াছি।

আপনাকে কেউ এসে বলুক “আমি মঙ্গল গ্রহের প্রানী” কিরকম রিয়্যাক্ট করবেন? ওদের মধ্যে অনেকে ঠিক ওরকমই করেছিল। অনেকটা সময় লেগেছিল ওদের বোঝাতে জিনিসটা। আসলে কি বলুন তো ওদেরকে যেভাবে ট্রিট করা হয়, সমাজে ওদের যে জায়গায় রাখা হয় তাতে ওদের কাছে এটা “এলিয়েন”-ই বটে। তবে ওদের মধ্যেই কয়েকজন বয়স্কা দিদি এগিয়ে আসেন এবং আমার উদ্দেশ্যসাধনে সহায়তা করেন বাকিদের বুঝিয়ে।
“তুমি আমাদের দাদা হবে?”- জ্বলজ্বলে চোখে এক বোনের ছোট্ট প্রশ্নটায় বুকটা একটু চিনচিন করেছিল। জানেন? কি খুশী ওরা। বাচ্ছাগুলোকে বলছে,”বাবু মিষ্টি আন, মামা রাখি পরবে”। মানা করেছিলাম। এক দিদি উত্তর দিলেন, “আমাদের কাছে তোমায় দেওয়ার মতন কিচ্ছু নেই ভাই, দিদিদের ভালোবাসা নিয়ে একটু মিষ্টিমুখই করে যাও”। উত্তর দিতে পারিনি।

একবার দেখুন রাখি পরানোর সময় ওদের মুখ গুলো। ছোটো বাচ্চা ট্রেনের জানালা দিয়ে প্রথমবার গাছগুলো সরতে দেখে যে সারল্যে ভাবে গাছপালা গুলো চলমান, ঠিক সেই সারল্য, সেই আনন্দ ওদের চোখেমুখে। এতে কোনো খাদ নেই, কেবল স্নেহ আছে, ভাইয়ের জন্য ভালোবাসা আছে। একজন বললেন, “আমাদের একটাই ভাই”। ওদের দিদি বলে ডাকায় একজন মাথায় হাত রেখে বলেন, “যাদের কখনো মাগী ছাড়া কেউ কিছু ডাকেনি তাদের বোন, দিদি ডাকলে? এর থেকে বড় পাওনা আর কি আমাদের?” পাথরেরও কান্না পায় বুঝেছিলাম। জানেন, কতজন বললো ওদের এটা প্রথম রাখী। আমার পাওনা ওটাই।

জানি এই পদক্ষেপটাকে নিয়ে ভালো খারাপ দুটোই বলার মানুষ পাবো। সবাইকেই নিজস্ব মন্তব্য জানাতে সাদর আমন্ত্রণ। তবে জানিয়ে রাখি, আপনাদের কথায় “পাতি শো অফের জন্য” এটা আপলোড নয়। এটা দেখানোর কারন, যে মহিলা গুলোকে ‘বেশ্যামাগী’ ছাড়া কিছু ডাকেন না তারাও মেয়ে। আর পাঁচটা মেয়ের স্বভাবসুলভ দিদির মতো তারা ভাইকে আগলাতে জানে, বোনের মত আবদার করতে জানে। খালি নেই ওদের সেই সুযোগ। অবহেলা অবজ্ঞা ছাড়া যাদের কখনো কিছু জোটেনি, একটু ভালোবাসায় তারা কতটা খুশী হতে পারে সেটাই দেখানো কেবল। ওদের কাছ থেকে পাওয়া ওই নিখাদ স্নেহ সারাজীবন মনে বয়ে বেরাবো। আর পরের রাখিতে আবার যাবো রাখি পরতে ওই দিদি-বোনেদের কাছে। আসলে এবারে ওরা জানতো না, তাই কিছু সেরকম করতে পারলো না। সামনের বার একমাত্র ভাইকে মাংসভাত খাওয়াবে বলেছে। আমি আর যাই করি, ওই ভালোবাসা মেশানো মাংসভাত মিস্ করছিনা….

ওই দিদিদেরকে ভালোবাসা আর বোনগুলোকে স্নেহজ্ঞাপন করে সবশেষে একটা কথা না বললেই নয়…  ভদ্র সমাজের নোংরা অংশ কেউ বলে বেশ্যা, কেউ ডাকে মাগী, ভুলোনা সেও মানুষ একটা, সেও পরাতে পারে রাখী… ❤ শেয়ার করার জন্য আলাদা করে জিজ্ঞাসা করার কোনো দরকার নেই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*